Bangla Bhuter Golpo| দুর্জয়বাবুর পুকুর| একটি ভৌতিক গল্প

Bangla Bhuter Golpo| দুর্জয়বাবুর পুকুর| একটি ভৌতিক গল্প

Bangla Bhuter Golpo ভুতের গল্প পড়তে ভালো লাগে এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। কমবেশি আমরা সকলেই ভুতের গল্প(Vuter Golpo) পড়েছি। আজ আপনাদের জন্যে রইলো একটা হাড় হিম করা ভুতের গল্প (Bhuter Golpo)। গল্পের নাম- দুর্জয়বাবুর পুকুর। লেখা- দীপঙ্কর দাস।

 

দুর্জয়বাবুর পুকুর

(একটি ভৌতিক গল্প)

 

বহু পুরোনো অভ্যেস হঠাৎ করে পালটে ফেলা খুবই কঠিন তা আজ টের পাচ্ছি। সকাল দশটার মধ্যে কলেজে জয়েন করার কথা অথচ ট্রেন থেকে নেমে একটা টোটো বা অটোর দেখা নেই। ঘুম ভাঙতে মাত্র আধঘন্টা লেট হলেও বাড়ি থেকে জলের বোতল, ঘড়ি আর মোবাইল ফোন আনতে ভুলে গেছি তা মনে পড়লো ট্রেনের কামড়ায় বসে। চাকরির প্রথম দিনই লেট হলে ব্যাপারটা খারাপ দেখায়। কন্ট্রাক্টচুয়াল ডেটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে হরিহরপুর মহাবিদ্যালয়ে আজই প্রথম দিন। স্টেশন থেকে নেমে অনেকটা ভেতরের দিকে এই কলেজ। যেতে গেলে টোটো বা অটো তো লাগবেই। হেঁটে যাওয়ার প্রশ্নই নেই কারন হেঁটে গেলে অন্তত ঘন্টা খানেক লেট হবেই। অগত্যা অপেক্ষা। স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে একটা পান, বিড়ির ছোট দোকান দেখে সেখানে দাঁড়ালাম। একটা নেভিকাটের প্যাকেট কিনে সেখান থেকে একটা বের করে জ্বালিয়ে নিলাম। তারপর দোকানদারের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলাম-

আচ্ছা এই হরিহরপুর মহাবিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্যে টোটো বা অটো কোথা থেকে পাওয়া যাবে বলুন তো। এখানে তো কোনো কিছুই দেখছি না।

দোকানদার বললেন-

এখান থেকে কিছু পাবেন না।

আপনি একটু এগিয়ে যান সামনে একটা মোড় পড়বে মা শীতলা মোড়। ওখানে দেখবেন টোটো স্ট্যান্ড রয়েছে সেখান থেকে পাবেন।

তারপর আমি আবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম –

আচ্ছা আর এই মোড়টা কতটা? হেঁটে কতক্ষন লাগতে পারে তাও?

তিনি বললেন-

বেশিক্ষন না। মিনিট পাঁচেক।

আচ্ছা বেশ বলে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে হাঁটা লাগালাম।

কিছুটা দূর যেতেই পেছন থেকে একটা ভটভট শব্দ এগিয়ে আসতে লাগলো। কয়েকসেকেন্ডের মধ্যেই শব্দটা আমার কানের কাছে এসে থেমে গেলো। দেখলাম আমার পাশেই এসে দাঁড়িয়েছে একটা মোটর ভ্যান। এই ভ্যানগুলো পায়ে টানা নয়। মোটর লাগানো। আমি জানিনা লোকে এটাকে কি বলে ডাকে তবে আমার কাছে এটা ভ্যাটো হিসেবেই পরিচিত। ভ্যাটো থেকে একটা লোক নেমে গেলেন আর তার কাছ থেকে ভাড়া নিতে নিতেই ভ্যাটো চালক আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন-

কোথায় যাবেন বাবু?

হাত থেকে সিগারেটটা ফেলে বললাম-

হরিহরপর মহাবিদ্যালয়ে। যাবেন?

ভ্যাটোচালকের ভদ্রলোক ঘাড় নেড়ে বললেন-

ওদিকে তো যাচ্ছিনা বাবু। আজ কলেজ ছুটি। যাওয়ার প্যাসেঞ্জারও পাবোনা আর আসারও। তবে পঞ্চাশটা টাকা দিলে আপনাকে একা নিয়ে যেতে পারি।

টাকা নিয়ে আমার কোনো সমস্যাই ছিলোনা। আর টোটো গাড়ির থেকে এইধরনের ভ্যানে যেতে আমার বেশ ভালই লাগে। তাছাড়াও প্রথম দিনে কলেজে ঢুকতে লেট হয়ে গেলে মুশকিল। তাই আর না করলাম না। বললাম-

চলো তবে।

Bangla Bhuter Golpo

 

Durjoybabur pukur vuter golpo

ভ্যাটো ভটভট শব্দ করে চলতে শুরু করলো। সামনে কিছুটা গিয়েই দেখলে পেলাম শীতলা মোড়।  সেখান থেকে ডানদিকে ঘুরেই একটা সোজা রাস্তা। সেদিকেই ভ্যাটো ঘুরিয়ে নিলো চালক। সোজা রাস্তা। অনেকটা গ্রাম্য এলাকা। লোকজনের সেরকম বাস নেই বললেই চলে। চারিদিকে কেবল খালি জমি আর মাঠ। অন্তত মিনিট পনেরো পরে এসে পৌছলাম সেই কলেজের সামনে। হরিহরপুর মহাবিদ্যালয়। ভ্যাটো থেকে নেমে ভাড়া দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-

আচ্ছা কটা বাজে? দশটা কি বেজে গেছে?

ভ্যাটোচালক ভদ্রলোক বাঁহাতটা ঘড়ি দেখার মত করে দেখে বললেন-

না বাবু দশটা বাজেনি। এখনো তিন মিনিট বাকি।

কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললাম। যাক!

 

HAPPY NEW YEAR 2023 CAPTIONS

 

কিন্তু আশ্চর্য হলাম লোকটার হাতে তো কোনো ঘড়িই নেই। কি দেখে টাইম বললেন তবে? নাকি ভুল সময় বললেন? লোকটা কি পাগল? দেখে তো তা মনে হয়না । পোশাক বেশ পরিচ্ছন্ন । চেহারাও বেশ স্বাস্থ্য়বান। বেশ মোটা গোফ রয়েছে। ভদ্রলোকের কথাবার্তাও বেশ নমনীয়। পাগল বলে তো মনে হয় না। তাহলে কি আন্দাজে সময়টা বললেন বাঁহাতটা ঘড়ি দেখার মত করে উচিয়ে? এত না ভেবে ওনাকেই জিগ্যেস করে দেখি। কিন্তু পেছন ফিরতেই দেখি কেউ নেই। না আছে সেই মোটর ভ্যান না সেই ভ্যানের চালক। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কোথায় উধাও হয়ে গেল লোকটা। বুঝে উঠতে পারলাম না। এত তাড়াতাড়ি তিনি যদি চলেও গিয়েও থাকেন তবে মোটরের শব্দ তো কানে এলোনা। কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগলো বিষয়টা। আর না ভেবে সামনে এগিয়ে গেলাম। বড় গেট পার করে ঢুকলাম কলেজের ভেতরে।  ঢুকেই দেখলাম সামনে একটা খেলার মাঠ। মাঠের বাঁদিকেই বড়ো দোতলা বিল্ডিং সেখানেই ক্লাসরুম গুলো। বিল্ডিং এর মাঝবরাবর একটা  প্রবেশদ্বার। সেখান থেকেই ঢুকে গেলাম ভেতরে। কলেজ ছুটি তাই ছাত্রছাত্রীও নেই। ভেতরে ঢুকে বুঝতে পারছিলাম না কোনদিকে যাবো। অফিসরুমটাই বা কোনদিকে। তখনই সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার মতো পায়ের শব্দ পেলাম। বুঝলাম কেউ একটা নেমে আসছে সিঁড়ি দিয়ে। আমিও সিঁড়ির কাছে এসে এগোতেই দেখলাম একি এইতো সেই ভ্যাটো চালক। এ এখানে কি করে এলো। কিছুটা হতবাক হয়ে গেলাম। ভাবলাম মনের ভুল। কিন্ত মনের ভুল হয় কি করে একই চেহারা সেই একই গোঁফ। একই জামাকাপড়। আশ্চর্য। মনে হলো তাকে জিজ্ঞেস করি আপনার ভ্যাটোতে করেই এলাম না? কিন্তু কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারিনি। লোকটা হনহনিয়ে নীচে নেমে গেলেন। আমার দিকে পর্যন্ত তাকালেনও না। কিসের এতো তাড়া বুঝতেও পারলাম না । আমিও সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলাম উপরে। উপরে উঠে ডানদিকে দেখলাম দুটো ক্লাস রুম। তারপরেই অফিসরুম। অফিস রুমে বসে আছে একজন মাঝবয়সি ভদ্রলোক। তাকেই বললাম। আমি নিত্যানন্দ সামন্ত। ডাটা এন্ট্রি অপরেটার হিসেবে আজই জয়েন করবো। লোকটা চেয়ার থেকে উঠে কিছুটা এগিয়ে এসে বললেন আরে আসুন আসুন। আমি এই কলেজেরই হেড ক্লার্ক মহাদেব সাউ। স্যারেরা কেউ আসেনি এখনো তবে চলে আসবেন কিছুক্ষনের মধ্যে। বসুন। বসুন। আসতে কোনো অসুবিধে হয়নি তো? আমি বললাম না না সেরকম কোনো অসুবিধে হয়নি। স্টেশন থেকে নেমে কিছুটা হাঁটতেই ভ্যাটো পেয়ে গেছিলাম।

– ভ্যাটো? বলেই তিনি কেমন যেন চুপ করে গেলেন।

-ওই যে মোটর লাগানো যেই ভ্যান গুলো হয়না ওগুলো। আমি বললাম।

শুনে তিনি কিছুটা ঘাড় নাড়লেন। তবে তার চোখে মুখে কেমন অসস্থিবোধ ফুটে উঠছিল তা বেশ বুঝতে পারছিলাম। কিছু হয়ত বলতে চাইছেন অথচ বলতে পারছেন না বলেই মনে হলো। তারপর দেখি টেবিলে রাখা জলের বোতল টা তুলে নিলেন।  ঢকঢক করে খেয়ে নামিয়ে রাখলেন টেবিলে। তারপর আর কিচ্ছু বললেন না। নিজের কাজে লেগে লেগেন ফাইলপত্র নিয়ে। আমার বসে থাকার মিনিট দশকের মধ্যেই স্যারেরা চলে এলেন। যেহেতু কলেজ ছুটি সব স্যারেরা তাই আজ আসবেন না। দুইজন এসেছেন মাত্র। প্রিন্সিপ্যাল স্যার বিনয় মজুমদার। সংস্কৃতের কৃষ্ণপদ গোলদার।

ভৌতিক গল্প

অফিস রুমের পাশেই প্রিন্সিপ্যাল স্যারের রুম। কিছুক্ষণ বাদেই আমাকে ডাকা হলো। আমি গেলাম। জয়েনিং ফর্ম্যালিটি পূরণ করার জন্যে আমার কিছু  ডকুমেন্ট এর জেরক্স প্রিন্সিপ্যাল স্যারের কাছে জমা দেওয়ার ছিল। সেটা দিলাম। তিনি কলেজ সম্পর্কে অনেক কথা বললেন। সেখান থেকেই জানলাম এই কলেজে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। আজ কলেজ অফিসিয়ালি ছুটি নেই তবে কিছু অফিসিয়াল কাজ পেন্ডিং থাকায় ছাত্রছাত্রীদের ছুটি দেওয়া হয়েছে কারণ সামনের সপ্তাহেই ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চপদস্থ স্যারেরা আসবেন পর্যবেক্ষণ করতে। আর অফিসিয়ালি কিছু কাজের মধ্যে একটা হলো  পনেরোজন নতুন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছে তাদের ভর্তির ডিটেইলস আপলোড করা অনলাইনে ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটে এবং এই কাজের আজই লাস্ট ডেট। আর শেষে তিনি বললেন আমার কাজে কোনো অসুবিধে হলে যেন কৃষ্ণবাবুকে জানাই।  তিনিই আমাকে বাকিটা বুঝিয়ে দেবেন। আমিও অফিস রুমে এসে কাজে লেগে পড়লাম। ডেস্কে রাখা নতুন ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের ফিলাপ করা ফর্ম ও তাদের ডকুমেন্টের জেরক্স । সেগুলোই পরপর এন্ট্রি করতে হবে। তারপর ডকুমেন্ট গুলো স্ক্যান করে আপলোড। কাজ শুরু করতে যাবো অমনি গোলোযোগ শুরু। সার্ভার প্রচন্ড স্লো। বুঝলাম লাস্ট ডেটে এসব কাজ করতে হলে এধরনের ঝক্কি তো পোহাতেই হবে। ওই অবস্থা তেই তিনটে ফর্ম এন্ট্রি করতে লেগে গেলো পাক্কা আড়াইঘন্টা।

ওদিকে প্রিন্সিপাল স্যার এসে জিগ্যেস করলেন-

কাজ কতদূর ?

বললাম-

ইউনিভার্সিটির সার্ভার যা স্লো তাতে তিনটে হয়েছে মোটে। এখনো বারোটা মতো বাকি।

প্রিন্সিপাল স্যার আরো একবার মনে করিয়ে দিয়ে বললেন ওগুলো কিন্তু আজকের মধ্যেই ওদের সাইটে এন্ট্রি ও ডকুমেন্ট আপলোড করতে হবে। যেহেতু আজই লাস্ট ডেট। তাই সার্ভার অন্যদিনের তুলনায় আজ স্লো থাকবে এটা স্বাভাবিক। প্রিন্সিপ্যাল স্যারের কথায় সায় দিয়ে বললাম সার্ভার ঠিক থাকলে এটা কয়েকঘন্টার কাজ মাত্র। আপনি চিন্তা করবেন না আমি সময়ের আগেই এন্ট্রি করে দেবো।

করে দেবো তো বলে দিলাম কিন্তু সার্ভার এতো ভোগাবে জানা ছিলোনা। মাথাও ধরে গেছে। একটু ব্রেক নিয়ে অফিসরুম থেকে বেরিয়ে নীচে আসলাম দেখলাম কৃষ্ণবাবু নীচেই রয়েছেন। তিনি আমাকে দেখে হাত নেড়ে ডেকে বললেন-

কতদূর কাজ?

আমি বললাম-

এখনো বারোটা মতো বাকি।

এখন আর এন্ট্রি করে লাভ নেই বললেন কৃষ্ণবাবু।

-লাঞ্চ করেছেন?

বললাম- না।  এখনও করিনি। তবে এন্ট্রি করবোনা বলছেন?

এখন করে লাভ নেই। কারন শেষদিনে এরকম সার্ভারের অবস্থা প্রতিবছরেই হয়। শেষে আমাকে আর তোমাকেই থেকে যেতে হবে রাত অবধি।

থেকে যেতে হবে ? রাত অবধি ? মানে?- আমি জিগ্যেস করলাম।

সেই সময়ই উপর থেকে নীচে নেমে হেড ক্লার্ক মহাদেববাবু আমাদের এসে জানালেন প্রিন্সিপ্যাল স্যার আমাকে ও কৃষ্ণবাবুকে ডাকছেন।

কৃষ্ণবাবু মৃদু হেসে বললেন-

ওই দেখুন ডাকও এসে গেছে।

আমরা দুজনেই নীচ থেকে উঠে উপরে গেলাম। প্রিন্সিপ্যাল স্যারের রুমে ঢুকতেই প্রিন্সিপ্যাল স্যার বললেন-

তোমার তো আজ প্রথম দিন। আবার ওদিকে ভর্তির লিস্ট এন্ট্রি ও আপলোড করার আজই লাস্ট দিন। কয়েকমাস ডাটা এন্ট্রি অপারেটর না থাকায় কোনো এন্ট্রিই হয়নি। যদিও সেরকম ছাত্রছাত্রী নেই এই কলেজে তবে আগের মাসে ওই পনেরোজন মতো ভর্তি হয়েছে। তারমধ্যে তুমি তো তিনটে সাবমিট করেছ বললে। বাকি  বারোটা মতো তোমাকে আজকের মধ্যেই শেষ করতে হবে। আসলে শেষদিনে সার্ভার খুবই খারাপ থাকে। কিন্তু অসুবিধে নেই সন্ধ্যা ছটার পর সার্ভার ঠিক হয়ে যায়। আগের বারেও যিনি ছিলেন তিনি ছটার পর সব এন্ট্রি করেছিলেন। এখন তোমার ট্রাই করেও কোনো লাভ হবেনা। কলেজ ছুটির টাইম পাঁচটা তবে তুমি যদি ছটা অবধি থেকে কাজটা যদি করে দিয়ে যাও তো খুবই ভালো হয়। আমাকে কলেজের কাজেই এক্ষুনি বেরোতে হবে। ইউনিভার্সিটির দিকে যাবো।  সেখান থেকে কাজ মিটিয়ে ফিরতে ফিরতে সাতটা আটটা বেজে যাবে। ছটার পর যদি সার্ভার ভালো থাকে তবে একাজ করতে তোমার ঘন্টা দুইয়ের বেশি সময় লাগবেনা আশা করি।

আমি আপত্তি করলাম না। মাথা নেড়ে বললাম-

আচ্ছা।

হেড ক্লার্ক আর কৃষ্ণবাবু তোমার সাথে থাকবেন। কোনো অসুবিধে হলে কৃষ্ণবাবু তোমাকে সব বুঝিয়ে দেবেন। তারপর প্রিন্সিপ্যাল স্যার কৃষ্ণবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন-

কি কৃষ্ণবাবু  থাকবেন তো?

কৃষ্ণবাবু মৃদু হেসে বললেন-

না থেকে উপায় আছে কি স্যার? থাকবো।

আমরা দুজনেই বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে। কৃষ্ণ বাবু বললেন এখন আর এন্ট্রি করে তোমার লাভ নেই। থেকে যখন যেতেই হবে তখন বাকিটা ছটার পর করে নিও। এখন যাও লাঞ্চ টা সেরে নাও।

আমিও অফিস রুমে বসেই লাঞ্চটা সেরে নিলাম। ওদিকে মোবাইল ফেলে এসেছি বাড়িতে তাই হেড ক্লার্ক মহাদেব বাবুর কাছ থেকে ফোনটা চেয়ে বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিলাম ফিরতে লেট হবে।

 

সময়মত প্রিন্সিপ্যাল স্যার বেরিয়ে গেলেন। আমি কৃষ্ণবাবু আর হেড ক্লার্ক মহাদেববাবু নিজেদের মধ্যে গল্প করেই সময় কাটাচ্ছি। আর অপেক্ষা করছি কখন সার্ভার ঠিক হবে। কখন এন্ট্রি করবো আর বাড়ি যাবো। এই গল্পের মধ্যে সবাই সবার নিজেদের চাকরি জীবনের গল্প গুলো শোনাচ্ছিলেন। আমিও ওনাদের বললাম আমার বিষয়। দেখতে দেখতে দেখতে কখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে বুঝতে পারিনি। এমনিতে শীত কাল ৫টা বাজলেই অন্ধকার নেমে আসে। অফিসের ঘড়িতে দেখলাম পৌনে ছটা। ঘড়িতে সময় দেখার সাথে সাথেই মনে পড়ল ওই লোকটার কথা। কিভাবে ঘড়ি ছাড়াই বা হাত দেখে সময় বলে দিলো লোকটা? হুট করে উধাও হয়ে গেল কিভাবে? সিড়ি দিয়ে হনহনিয়ে নেমে ওই লোকটাই কি বেরোলো? সব কিছু যেন ঘেটে যাচ্ছে আমার। সবটা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে মাথার মধ্যে। মাথাটা ধরতে শুরু করেছে। ছটা বাজতে এখনো মিনিট পনেরো বাকি। কৃষ্ণবাবুকে বললাম-

আমি একবার নীচে যাচ্ছি। মিনিট দশেক পায়চারী করেই চলে আসবো।

INSTAGRAM CAPTIONS

এই বলে নীচে এলাম। নীচে নেমে কলেজের গেটের বাইরে বেরোলাম। কলেজের পাশ দিয়ে খালিজমি আর তার ধার বরাবর একটা সরু রাস্তা কলেজের পেছন দিকে চলে গেছে। সেই রাস্তা ধরে এগিয়ে একটা নেভিকাট বের করে ধরালাম। রাস্তাটা ধরে এগিয়ে গেলে কলেজের পেছনের দিকটা চলে যাওয়া যায়। হাটতে হাটতে এগোতে লাগলাম। কিন্তু বেশিদূর এগোতে এই অন্ধকারে সাহস হলোনা। সরু রাস্তার দুধারে চারপাশেই জঙ্গল। সাপ কোপের ভয় থাকতে পারে। আর এই জনমানুষহীন জঙ্গলে সাপে কাটলে আর রেহাই নেই। সোজা উপরে। অন্ধকার বেশ ঘনিয়ে এসেছে সিগারেট টা ফেলে নেভাতেই তা আরো স্পষ্ট হলো। কাছে মোবাইলও নেই যে ফ্ল্যাশলাইট টা অন করে আলো জ্বালবো। তক্ষনি রাস্তার ডানপাশের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কি যেন একটা দ্রুতগতিতে ছুটে গেল। এতটাই জোরে ছুটে চলে গেল তাতে বোঝার উপায় নেই সেটা কি। তারপর মিলিয়ে গেল অন্ধকারের মধ্যেই। জিনিষটা যেখানে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেলো সেখান থেকে ভট ভট ,ভট ভট করে সেই শব্দটা কানে আসতে লাগলো। এতো সেই চেনা শব্দ। সেই ভ্যাটো অর্থাৎ সেই মোটর ভ্যানের শব্দ আর সেখান থেকেই দেখা যাচ্ছে হেড লাইডের ঝাপসা আলো। দেখলাম ভ্যাটোটা চলছে না। একজায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এবার কেন জানিনা একটু ভয় পেলাম। তবুও মনে সাহস এনে ভাবলাম এগিয়ে দেখি। সেই সরু রাস্তা ধরেই এগিয়ে যেতে লাগলাম। যতো সামনের দিকে এগোচ্ছি ভট ভট শব্দটা ততটাই তীব্র হচ্ছে। এখন আমার কয়েক হাত সামনেই সেই মোটর ভ্যান। মোটর ভ্যানের সামনে আর কিছুটা এগোতেই হেডলাইটটা নিভে গেলো। চারিদিকে একেবারে ঘুঁটঘুটে অন্ধকার। ভ্যাটোর সামনে কেউ নেই। এই দিকটাই কলেজের সেই পেছনের দিক। সামান্য চাঁদের আলোর মধ্যে দিয়ে বুঝতে পারলাম সামনে ছোট্ট একটা মাটির বাড়ি তার চারপাশে। জঙ্গলে ঘেরা। ভট ভট করে যে শব্দটা হচ্ছিল সেটাও থেমে গেল কিন্তু তার রেশটা যেন তখনও আমার কানে বাজছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক অন্যরকম শব্দ। হ্যাঁ অন্যরকম। এবার জলের শব্দ। জলে কিছু চুবিয়ে ধুয়ে থুপ থুপ করে কাপড় কাচার শব্দ। কিন্তু সামনে কোথাও জল আছে বলে মনে হচ্ছেনা থাকলে থাকতেও পারে হয়ত আমিই জানিনা আর এই অন্ধকারে তা বোঝা প্রায় অসম্ভব। কাউকে চোখেও পড়ছেনা। বেশি এগিয়ে গেলেও বিপদ। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। ওই মুহুর্তেই জলে কিছু একটা ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দ। আর তখনি বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠলো। তারপরের সেই কাঁপড় কাচার মতো থুপ থুপ শব্দটা বন্ধ হলো। এখন অপরদিক থেকে ভেসে আসছে কি বীভৎস কান্নার আওয়াজ। যা শুনে আমার হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার জোগার। আমি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করতেই আমার হাতটা যেন কেউ ধরে টেনে রেখেছে। আমি ছাড়াতেও পারছিনা। কি ভয়ানক ঠান্ডা সেই হাত। ঘুটঘুটে অন্ধকার। জোরে  চিৎকার করার চেষ্টা করছি কিন্তু আমার কোনো শব্দই যেন গলা থেকে বেরচ্ছেনা। ওই বীভৎস কান্নার আওয়াজ তারমধ্যে আবার ভটভট করে মোটর ভ্যানটা চালু হয়ে গেল। আমি লোকটার হাত ছাড়াবার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু পারলাম না । ওদিকে মোটর ভ্যানটা কি জোড়ে আমার দিকেই ছুটে আসছে। সাথে সেই বিকট ভটভট  শব্দ। লোকটাও  নাছোড়বান্দা আমাকে ধরে রেখেছে। ওদিকে এগিয়ে আসছে সেই মোটর ভ্যান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ধাক্কা আমি কয়েকফুট ছিটকে গেলাম রাস্তার মাঝবরাবর। আমাকে পালাতে হবে। পালাতে হবেই। ভেবে উঠে পালাতে যাবো দেখি আমার সামনে সেই লোকটা। এতক্ষণ আমার হাত ধরে রেখেছিল যে, হ্যাঁ সেই লোকটা। এই লোকটাকে তো আমি চিনি। আমি চিনি। এ তো আমাদের কলেজের কৃষ্ণবাবু।

Bengali horror story

তার সেই মৃদু হাসি।  তবে সে হাসি এখন মৃদু নেই। চোখ দুটো জবা ফুলের মত লাল। কি ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমাকে জাপটে  ধরে রাখার চেষ্টা করতেই আমি দৌড় লাগলাম। আমার পেছন পেছন ছুটছেন তিনি। দৌড়তে দৌড়তে যেখানে এসে থামলাম তার সামনে যাওয়ার উপায় নেই। সামনে বিশাল পুকুর সেই ঘাঁটে বসে কাঁদছে এক মহিলা। সেই কান্নার আওয়াজই ভেসে আসছিল এতক্ষণ। বীভিৎস এই কান্নার আওয়াজে আমার কান যেন ফেটে যাচ্ছে। একটা হাত এবার পেছন থেকে এসে চেপে ধরলো আমার গলা। আমার জীভ বেরিয়ে আসছে। এ এক অস্বাভাবিক শক্তিশালী হাত। মহিলার কান্না থেমে গেলো। চারপাশ থেকে ভেসে আসতে লাগলো কেরোসিনের গন্ধ। হঠাৎ আগুন জ্বলে গেল মহিলাটির সারা শরীরে। লোকটা আমার গলা থেকে হাত সরিয়ে নিলো। দৌড়ে চলে গেল মহিলাটির দিকে, সেই আগুনের দিকে। এই লোকটিকেও আমি চিনি। এর মোটর ভ্যানে করেই তো এলাম। সেই একই চেহারা। একই মোটা গোঁফ। দেখতে দেখতে নিমেষের মধ্যেই লোকটি ঝাপ দিলো সেই আগুনে। দুটো দেহই জ্বলছে এখন। বিকট কান্নার আওয়াজ আর সেই সাথে মানুষ পোড়া গন্ধ। দম বন্ধ হয়ে আসছিল আমার। গা গুলিয়ে আসছে। হাত অসাড় হতে শুরু করেছে ততক্ষণে। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসতেই লুটিয়ে পড়লাম মাটিতে। তারপর আর কিচ্ছু মনে নেই।

 

যখন চোখ খুললাম দেখি চারপাশে মানুষের ভীড়। সকলেই তাকিয়ে আছে আমার মুখের দিকে। প্রত্যেকের চোখেমুখে জিজ্ঞাসার ছাপ স্পষ্ট। এদিকে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। ওনাদের দিকে উদ্দেশ্য করে বললাম একটু খাওয়ার জল হবে? ভীড়ের মধ্যে থেকে একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক এসে একটা জলের বোতল এগিয়ে দিলেন। তার হাত থেকে বোতলটা নিয়ে জল খেলাম। তিনিই এবার জিগ্যেস করলেন-

তোমাকে তো এই এলাকার বলে মনে হচ্ছেনা। ভয় টয় পেয়েছ বুঝি? চোখ দুটোতো এখনো লাল। আমরা না দেখতে পেলে এখনও তো অজ্ঞান হয়ে এই মরা পুকুরের মাঝেই পড়ে থাকতে।

জলটা খেয়ে এতক্ষণে কিছুটা সম্ভিত ফিরেছে আমার। একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে পুরো ঘটনাটাই ওদের বললাম। সবটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো সকলেই। তারপরে তারা যা জানালো তা শুনে আমি হতবাক।

 

হরিহরপুর মহাবিদ্যালয় বলে যে কলেজটি ছিলো তা বহুবছর আগেই বন্ধ হয়ে যায় ছাত্রছাত্রীর অভাবে। তবে সেখানে কৃষ্ণবাবু বলে একজন মাস্টার ছিলেন। ওই কলেজেই পড়াতেন তিনি। আর স্বাস্থ্যবান মোটা গোঁফওয়ালা যে লোকটি তার নাম দুর্জয়। কলেজের পেছনে দিকে যে রাস্তাটা গেছে সেখানেই ছোট্ট একটা মাটির বাড়িতে থাকত দুর্জয় ও তার স্ত্রী শেফালী। শেফালী শ্যামবর্ণা হলেও মুখশ্রী ছিলো দেখবার মত। বিয়ের দশবছর হয়ে গেলেও কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নি তাদের। তাদের বাড়িরই পাশে এই পুকুর। একসময় জল থৈ থৈ করতো। আর ছিলো প্রচুর মাছ। দুর্জয় এই গ্রামেই ভ্যান চালাতো। কিন্তু এই অঞ্চলে সেরকম ভাড়া হতোনা। পুকুরের মাছ বিক্রি করে যে বছর প্রচুর লাভ হয়েছিল সে বছরেই ভ্যানে মোটর লাগিয়ে নেই দুর্জয়। এই গ্রামে ওই প্রথম ভ্যানে মোটর লাগায়। তারপর থেকে গ্রাম ছাড়াও দুরে দুরে শহরে ভাড়া খাটতে যেত। দুর্জয়ের স্ত্রী শেফালী সেই সময় একাই থাকতো বাড়িতে। গ্রামে অনেকসময় কানাঘুসো শোনা যেত ওই কলেজের কৃষ্ণবাবুর সাথে শেফালির মেলামেশার কথা। কাজের অছিলায় কৃষ্ণবাবু অনেকরাত অবধি কলেজে থেকে যেতেন। সন্ধ্যার পর গ্রামের অনেকেই মাঝেমধ্যেই শেফালীকে কলেজ থেকে বেরোতে দেখেছে। গ্রামে বিষয়টা জানাজানি হতেই কথাটা কানে ওঠে দুর্জয়ের। দুর্জয় মানতে না চাইলেও একদিন শহর থেকে ভাড়া খেটে তাড়াতাড়ি বাড়ি ঢুকতেই বিপত্তি ঘটে। কৃষ্ণবাবুর সাথে ঘনিষ্ট অবস্থাতে দেখে ফেলে শেফালীকে। মাথায় রাগ চেপে যায় দুর্জয়ের। কৃষ্ণবাবু দুর্জয়দের বাড়ি থেকে কলেজের পেছনের সরু রাস্তা ধরে পালানোর চেষ্টা করাতেই বিপদ ঘটে। দুর্জয় মোটর ভ্যানে চেপে প্রচন্ড গতিতে এসে ধাক্কা মারে তাকে। মাথায় আঘাত লাগে কৃষ্ণবাবুর আর তক্ষুনি মৃত্যু। তারপর ঘরে ফিরে এসে দুর্জয় দেখে ঘরে শেফালী নেই। খোঁজাখুজি করে পুকুরের ঘাটে আসতেই দেখে কেরোসিন দিয়ে গায়ে আগুন দিয়েছে শেফালী। অর্ধেক পুড়েও গেছে। দুর্জয়ও সেই আগুনে ঝাপ দেয়। সেইদিন একই দিনে তিনটে মৃত্যু ঘটে।

তার কদিন পর থেকে দুর্জয়ের পুকুরের মাছগুলো মরে গিয়ে  ভেসে ওঠে জলে। তারপর থেকে এই পুকুরে জল থাকতোনা কখনই। বর্ষার সময় যতই জল থৈ থৈ করুক না কেন মাসখানের মধ্যে যা কে সেই। পুকুর শুকিয়ে কাঠ। পাশের গ্রামের কয়েকজন মাঝেমধ্যে ভটভট সব্দ শুনতে পায় আবার কেউ বলে কয়েকটা ছায়ামূর্তি দেখা যায় সন্ধ্যার পর থেকে। এই ঘটনার পর কেউ আর সাহস করে এ চত্তরে থাকেনি। সন্ধ্যার পর আসার তো প্রশ্নই নেই।

তাদের মুখ থেকে সমস্ত ঘটনা শোনার পর কিচ্ছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে রইলাম। মনে মনে ভাবলাম আমি সত্যিই ভাগ্যবান তাই এ যাত্রায় বিরাট রক্ষে পেয়েছি।

 


কেমন লাগলো আপনাদের এই ভৌতিক গল্পটি? ভালো লেগে থাকলে শেয়ার করতে একদম ভুলবেন না। ধন্যবাদ।

 

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল – Bengalicaptions

আরো কিছু>> দুই লাইনের কবিতা